দারিদ্র্য এমন অর্থনৈতিক অবস্থা, যখন একজন মানুষ জীবনযাত্রার ন্যূনতম মান অর্জনে এবং স্বল্প আয়ের কারণে জীবনধারণের অপরিহার্য দ্রব্যাদি ক্রয় করার সক্ষমতা হারায়। সাংস্কৃতিক স্বেচ্ছাচারিতা ও আগ্রাসন, জনসংখ্যার চাপ, অর্থনৈতিক দুর্দশা, সামাজিক ও রাজনৈতিক সমস্যা এবং বন্যা, জলোচ্ছ্বাস, খরা ইত্যাদির মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ দারিদ্র্য সৃষ্টি করে। সেলিনার বাবা-মা দারিদ্র্যের কারণে মাত্র পাঁচ দিন বয়সে তাকে রাস্তার পাশে ফেলে চলে যান। কয়েকজন গ্রামবাসী তাকে উদ্ধার করে একটি এতিমখানায় দেয়ার উদ্যোগ নেন। এ সময় একজন বিদেশি এনজিওকর্মী শিশুটিকে লালন-পালনের জন্য নিতে চাইলে গ্রামের লোকজন তার হাতে তুলে দেন। তারপর থেকে সেলিনা জার্মানিতেই বসবাস করছেন।
এরই মধ্যে কেটে গেছে ৪২ বছর। কিন্তু এখনও বাবা-মাকে ভুলতে পারেননি তিনি। বাবা-মায়ের সন্ধান পেতে ছুটে এসেছেন নিজের জন্মস্থান জামালপুরের সরিষাবাড়ীর গাইতিপাড়া গ্রামে। বাবা-মাকে খুঁজে না পেয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন বাংলাদেশে জন্ম নেয়া সেলিনা।

গতকাল বুধবার সন্ধ্যায় ময়মনসিংহ প্রেস ক্লাবে এসে সেলিনা জানান, তার পালক বাবা জন ম্যাকডোনাল্ড ১৯৭৬ সালের জুন বা জুলাই মাসে সরিষাবাড়ীর গাইতিপাড়া গ্রাম থেকে তাকে দত্তক নেন। ম্যাকডোনাল্ড তখন একটি বেসরকারি শিশু সংস্থার প্রতিনিধি হিসেবে বাংলাদেশে কাজ করতেন। বাংলাদেশে কাজ শেষে তিনি তাকে জার্মানি নিয়ে যান এবং পরে একটি স্কুলে ভর্তি করান। সেলিনার বয়স যখন ৬ বছর তখন তিনি জানতে পারেন যে, তাকে বাংলাদেশ থেকে নেয়া হয়েছে এবং ম্যাকডোনাল্ড তার পালক বাবা। সেলিনা জার্মানিতে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করেন এবং স্টেফান নামে এক জার্মান নাগরিককে বিয়ে করেন। তাদের অ্যাঞ্জেলা (২২) নামে একটি মেয়ে ও ফিন (১৫) নামে একটি ছেলে রয়েছে।

সেলিনা আরও জানান, স্বামীর সঙ্গে ছাড়াছাড়ি হওয়ার পর জার্মানির ফ্রাঙ্কফুর্ট শহরের কাছে একটি হাসপাতালের চিকিৎসক মার্ক সেয়ারারের সঙ্গে তার পরিচয় হয়। একই হাসপাতালে তিনিও চাকরি করেন। একপর্যায়ে তিনি সেয়ারারকে নিয়ে বাংলাদেশে আসার সিদ্ধান্ত নেন। গত ৪ অক্টোবর তিনি প্রথমবারের মতো সেয়ারারকে নিয়ে ঢাকায় আসেন। এক জার্মান প্রবাসী বাংলাদেশির সহায়তায় এখানে এক হোটেলে ওঠেন। ওই বাংলাদেশি ময়মনসিংহে বসবাসরত অপর এক জার্মান প্রবাসী দেলোয়ার হোসেনকে অনুরোধ করেন সেলিনাকে সহায়তা করার জন্য। সেলিনা গত ৭ অক্টোবর ময়মনসিংহে আসেন এবং দেলোয়ারের সহায়তায় জামালপুরের গাইতিপাড়া গ্রামে যান। দেলোয়ার জানান, গত মঙ্গলবার সরিষাবাড়ীতে প্রায় ৪ ঘণ্টা খোঁজাখুঁজির পর সেলিনার জন্মস্থান গাইতিপাড়া গ্রামের সন্ধান পাওয়া যায়। কিন্তু সেলিনার ছোটবেলার ছবি দেখিয়ে এবং বিভিন্ন পরিচয় দিয়েও তার বাবা-মায়ের সন্ধান পাওয়া যায়নি। সেলিনা বিভিন্ন বয়সের মানুষের সঙ্গে কথা বলেন এবং আবেগজড়িত কণ্ঠে তার বাবা-মায়ের খোঁজ করেন।

সেলিনা জানান, জন্মস্থানের প্রতি মায়ার কারণে তিনি বাংলাদেশে আসেন এবং বাবা-মায়ের খোঁজ করেন। এবার আক্ষেপ নিয়ে ফিরে গেলেও আবারও তিনি বাংলাদেশে আসবেন। তিনি আরও দুই সপ্তাহ বাংলাদেশে থাকবেন বলে জানান। উল্লেখ্য, বাংলাদেশের দারিদ্র্যাবস্থার জন্য বহুবিধ বিষয়, যথা অতিরিক্ত জনসংখ্যার চাপ, মাথাপিছু সীমিত প্রাকৃতিক সম্পদ, সম্পদের বণ্টন ও ব্যবহার, অশিক্ষা, মাথাপিছু কম পরিমাণ আবাদযোগ্য জমি ও বনভূমি, রুগ্নস্বাস্থ্য ও স্বাস্থ্যব্যবস্থা, পয়ঃনিষ্কাশন সমস্যা, পরিবেশের অবক্ষয়, বন ধ্বংস, কৃষির ওপর অতি নির্ভরশীলতা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, নারী নির্যাতন ও নারীদের বঞ্চিতকরণ এবং দুর্বল প্রশাসনিক ব্যবস্থা দায়ী।