কয়েক দিন ধরে টিভি সাংবাদিকেরা ফোন করছেন। তাঁরা সাক্ষাৎকার নেবেন। বিষয় ৫ জানুয়ারির নির্বাচন। প্রশ্ন তাঁদের একটাই। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির সংসদ নির্বাচনে অংশ না নিয়ে বিএনপি কি ভুল করেছিল? একতরফা এই নির্বাচনে আওয়ামী লীগের দায় নিয়ে তাঁদের প্রশ্ন নেই, এর সার্বিক মূল্যায়ন নিয়েও তঁাদের আগ্রহ নেই। তঁাদের একটাই অনুরোধ, বিএনপির ভুল হয়েছিল কি না বলেন স্যার!
এঁরা নতুন প্রজন্মের টিভির সাংবাদিক। এই টিভি চ্যানেলগুলো বর্তমান সরকারের আমলের, এর মালিকানা এবং কর্তৃত্ব সরকারের ঘনিষ্ঠ বা অনুগত লোকজনের। সংবাদে হোক, টক শোতে হোক, রাজনৈতিক কোনো প্রসঙ্গ এলে তঁারা আগ্রহী প্রধানত বিএনপিকে তুলাধোনা করার বিষয়ে। তুলাধোনা করার লোকের অভাব নেই এখন দেশে। তবু তঁারা মরিয়া বাকি সবাইকে বিএনপির সমালোচনায় শামিল করানোতে।
টক শো হলে, বিশেষ করে লাইভ টক শো যখন হয় তখন বিএনপির ভুলের সঙ্গে সঙ্গে অন্যদের ভুলটাও বলা যায়। সংবাদে প্রচারের জন্য নেওয়া সাক্ষাৎকারে তার উপায় নেই। দেখা গেল দেশে কোনো সমস্যার জন্য সবার ভূমিকা নিয়েই বললাম। প্রচারের জন্য কেটেছেঁটে শুধু বিএনপির সমালোচনার অংশটাই প্রচারিত হলো।
এই সমস্যার সমাধান হলো কোনো সাক্ষাৎকার না দেওয়া। কিন্তু এতেও অসুবিধা আছে। তখন কোনো একটা বিষয় নিয়ে শুধু এক পক্ষের একতরফা সমালোচনাই শোনে মানুষ। গণমাধ্যমের প্রতি বীতশ্রদ্ধ হয় তারা, অথবা বিষয়টি সম্পর্কে বিভ্রান্ত।
৫ জানুয়ারির নির্বাচন নিয়ে একতরফা মূল্যায়ন হলে তা দেশের গণতন্ত্র ও সুশাসনের জন্য আরও অমঙ্গলজনক হবে। কারণ, এই নির্বাচন সরকারের গণপ্রতিনিধিত্বমূলক চরিত্র সম্পর্কে প্রশ্নই শুধু জন্ম দেয়নি, দেশের নির্বাচনব্যবস্থা সম্পর্কেও মানুষের মনে প্রবল অবিশ্বাস ও অনাস্থার সৃষ্টি করেছে। এর সঠিক বিশ্লেষণ হলেই কেবল আমরা ভবিষ্যতের করণীয় সম্পর্কে ধারণা পেতে পারি।
২.
৫ জানুয়ারির নির্বাচন নিয়ে বাংলাদেশে দুটি প্রধান দৃষ্টিকোণ রয়েছে। একটি দৃষ্টিকোণ তুমুল সমালোচনামূলক। এই দৃষ্টিকোণ থেকে বলা হয় যে ৫ জানুয়ারির নির্বাচন বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে খারাপ ও অপ্রতিনিধিত্বশীল নির্বাচনের একটি। এই নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটার ভোট দেওয়ার সুযোগ পাননি, সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে প্রার্থীকে কোনো ভোটই চাইতে হয়নি, সংখ্যাগরিষ্ঠ দল এতে অংশ নেয়নি, এমনকি যে কয়টি আসনে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে, সেখানেও সুষ্ঠুভাবে নির্বাচন হয়নি। বলা হয় যে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল করার মাধ্যমে এবং পরে প্রধানমন্ত্রী পদে শেখ হাসিনাকে বাদ দিয়ে নির্বাচনকালীন সরকার গঠনের প্রস্তাব না মেনে নিয়ে আওয়ামী লীগ এই পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছিল। অনেকে এ-ও মনে করেন যে নির্বাচন-পূর্ববর্তী সময়ের জনমত জরিপ, স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলোর ফলাফল এবং বাংলাদেশের চিরন্তন রাজনৈতিক সংস্কৃতি (ক্ষমতাসীন দলের পরাজয়) অনুসারে ৫ জানুয়ারি একটি নিরপেক্ষ নির্বাচন হলে এতে ফলাফল সম্পূর্ণ অন্য রকম হতে পারত।
৫ জানুয়ারির নির্বাচনের অন্য পক্ষের লোকজনের প্রায় কেউই এই নির্বাচনের গুণগত মান নিয়ে তেমন কোনো উচ্চবাচ্য করেন না, বলেন না যে এটি একটি ভালো নির্বাচন ছিল। তবে তাঁদের মতে, এই নির্বাচন মন্দ দিকের পুরো দায়দায়িত্ব বিএনপির। তঁাদের দৃষ্টিকোণ থেকে বলা হয় যে এই নির্বাচনে সবার অংশগ্রহণ অবাধ করার জন্য ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ বিএনপির সঙ্গে আন্তরিকতাপূর্ণ আলোচনা করেছিল, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী নির্বাচনকালীন সরকারে অংশ নেওয়ার জন্য বিএনপিকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন, এমনকি নির্বাচনের সময় অতি গুরুত্বপূর্ণ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বিএনপিকে দেওয়ার প্রস্তাবও করেছিলেন। বলা হয় যে বিএনপি সরকারের আন্তরিকতায় সাড়া না দিয়ে সহিংস আন্দোলনের মাধ্যমে এই নির্বাচন বয়কটের ঘোষণা দিয়েছিল বলেই নির্বাচন এমন একতরফাভাবে অনুষ্ঠিত হয়েছিল।
৩.
এই দুই বয়ানের কোনোটি কি পুরোপুরি অসত্য? আমাদের সমস্যা হচ্ছে আমরা মনে করি, একটি বয়ান সত্যি হলে অন্যটি পুরোপুরি মিথ্যা। কিন্তু আমাদের এখন সময় এসেছে উপলব্ধি করার যে উপরিউক্ত দুই বয়ানই সত্যি, অন্তত অনেকাংশে সত্যি। এই নির্বাচনে অংশ না নেওয়াও ভুল হয়েছিল, এই নির্বাচন একতরফাভাবে অনুষ্ঠিত করাও ভুল হয়েছিল।
এসব ভুল মোচনের সুযোগ তখন ছিল। সংবিধানের ১০৬ অনুচ্ছেদ মোতাবেক সুপ্রিম কোর্টের পরামর্শ নিয়ে নির্বাচনটি পিছিয়ে দিয়ে সবার অংশগ্রহণের শেষ একটি চেষ্টা করার সুযোগ ছিল। এমন প্রস্তাব তখন নাগরিক সমাজের একটি বড় অংশের পক্ষ থেকে নির্বাচনের কিছুদিন আগে করাও হয়েছিল।
এটি সম্ভব না হলে ৫ জানুয়ারি নির্বাচনের সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা পালন করে অল্প সময়ের মধ্যে আরেকটি নির্বাচনের ঘোষণা দেওয়া সম্ভব ছিল। প্রধানমন্ত্রী নিজে এমন সম্ভাবনার কথা বলেছিলেন। ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের পর আওয়ামী লীগ সে রকম কিছু করার কোনো উদ্যোগ নেয়নি, সে রকম উদ্যোগ নিতে আওয়ামী লীগকে প্রভাবিত করার নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতিও বিএনপি করতে পারেনি। বরং ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের বর্ষপূর্তিতে জনসভা করার সুযোগ না পাওয়ার পর বিএনপি ও তার সঙ্গীরা অধৈর্য হয়ে যে সহিংস আন্দোলন শুরু করে তা মধ্যবর্তী নির্বাচনের দায় থেকে আওয়ামী লীগকে অনেকাংশে অবমুক্ত করে দেয়।
৫ জানুয়ারি এবং এর পরের ঘটনাপ্রবাহে তাই সবার ভুল ছিল। কারও বেশি কারও কম। ভুল পরিমাপের চেয়ে জরুরি বিষয় হচ্ছে এটি উপলব্ধি করা যে ৫ জানুয়ারিকেন্দ্রিক ভুলের মাশুল দিচ্ছে কোনো না কোনোভাবে সবাই। এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের মানুষ ভোটাধিকারের অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়েছে, দেশে নির্বাচনব্যবস্থার প্রতি আস্থা মারাত্মকভাবে বিনষ্ট হয়েছে,
জনমতের গুরুত্বের প্রতি সরকারের অবজ্ঞা বৃদ্ধি পেয়েছে, শক্তিশালী বিরোধী দলের অভাবে ক্ষমতার ভারসাম্য নষ্ট হয়েছে, নাগরিক সমাজ বিভক্ত হয়েছে, গণমাধ্যমের ওপর সরকারের খবরদারি বেড়েছে, আওয়ামী লীগ ও বিএনপি উভয়ের প্রতি রুষ্ট মানুষের সংখ্যা বেড়েছে, বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে বহু অন্যায্য আবদার মেনে নিতে হয়েছে, সুস্থ রাজনীতির অভাবে জঙ্গিবাদ মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। সবচেয়ে যা ভয়াবহ এর মধ্য দিয়ে মানুষের গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষার পরিবেশ মারাত্মকভাবে বিনষ্ট হয়েছে।
৪.
৫ জানুয়ারি থেকে তাহলে কী শিখব আমরা? শুধু দোষারোপ করা? নাকি এগোনোর পথটাও খোঁজা? আমার মতে দ্বিতীয়টি। কারণ, ইতিহাসচর্চা মানে বর্তমান থেকে অতীতের পানে ক্রুদ্ধভাবে চেয়ে দেখা নয়। প্রখ্যাত আমেরিকান ইতিহাসবিদ উইলিয়াম অ্যাপলম্যানের মতে, ইতিহাসচর্চার বরং উদ্দেশ্য হওয়া উচিত অতীতে ফিরে গিয়ে আগের ধারণা ও দৃষ্টিকোণগুলোর সীমাবদ্ধতা উপলব্ধি করা এবং এভাবে বর্তমানের করণীয় সম্পর্কে আরও গভীর ও যৌক্তিক সিদ্ধান্তে আসা।
আমার মতে, এটি করতে হলে আমাদের অন্তত এটি বুঝতে হবে ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের মধ্যে আর যা-ই হোক কোনো গৌরব নেই। এই নির্বাচন কাউকে বিজয়ী করেনি। এমন নির্বাচন আর কখনো না হতে দেওয়ার মধ্যেই আমাদের কল্যাণ নিহিত।
আমাদের কল্যাণ নিহিত সুষ্ঠু নির্বাচনের মধ্যে। আমরা সর্বশেষ নারায়ণগঞ্জ নির্বাচনেই দেখেছি সুষ্ঠু নির্বাচন মানুষকে কতটা আশাবাদী করে তোলে। নারায়ণগঞ্জে আইভীর জয়ে আওয়ামী লীগ বিজয়ী হয়েছে, আবার ওয়ার্ড কমিশনার নির্বাচনে অংশ নিয়ে ১২টিতে জিতে বিএনপিও জয়ী হয়েছে।
নারায়ণগঞ্জ নির্বাচন আবারও প্রমাণ করেছে সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন সরকারের সদিচ্ছা। এই সদিচ্ছা আমরা আগেও স্থানীয় নির্বাচনে সরকারের মধ্যে দেখেছি (যেমন ২০১৩ সালের গাজীপুর নির্বাচন), নির্বাচন কমিশন তাই তখনো নিরপেক্ষভাবে কাজ করতে পেরেছিল। কিন্তু একই কমিশন আবার সরকারের চাপে পড়ে ২০১৪ সালের জাতীয় নির্বাচনে বহু প্রশ্নবিদ্ধ পদক্ষেপ নিয়ে সমালোচিত হয়েছিল (যেমন সময় পার হওয়ার পর আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থীদের মনোনয়ন প্রত্যাহারের আবেদন গ্রহণ করা, অন্যদিকে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে জাতীয় পার্টির প্রার্থীরা মনোনয়ন প্রত্যাহার করার পরও তঁাদের প্রার্থিতা বহাল রাখা ইত্যাদি)।
নির্বাচন কমিশনের এই ভূমিকা যতই নজিরবিহীন হোক, তা অস্বাভাবিক ছিল না। কারণ, বাস্তবতা এটিই যে বাংলাদেশের স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে কখনো কোনো জাতীয় নির্বাচনে নির্বাচন কমিশন দলীয় সরকারগুলো ইচ্ছার বাইরে গিয়ে কাজ করতে পারেনি।
হয়তো এই বাস্তবতা থেকেই আওয়ামী লীগ নেত্রী ২০১৩ সালে একটি নির্বাচনকালীন সরকারের প্রস্তাব দিয়েছিলেন। তাঁর এই দৃষ্টিভঙ্গি হয়তো তখনকার সমস্যা সমাধানের জন্য যথেষ্ট বা পর্যাপ্ত ছিল না, কিন্তু তা অবজ্ঞা করার মতোও ছিল না। আমি মনে করি, বর্তমান বাস্তবতায় এই প্রস্তাব ধরে এগোলেই আমরা ৫ জানুয়ারির মতো একটি ভুলে ভরা অতীত থেকে সামনের দিকে এগোতে পারি।
আমাদের অবশ্যই ভবিষ্যতে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন কমিশন গঠন এবং নির্বাচনী আইনের প্রয়োজনীয় সংস্কার করতে হবে। কিন্তু এসবের পাশাপাশি আমাদের গ্রহণযোগ্য একটি নির্বাচনকালীন সরকারও গঠন করতে হবে। এসব কাজে সরকারকে বিরোধী দল কর্তৃক সর্বতোভাবে সহায়তা করতে হবে। আমার মতে, এসবই ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের শিক্ষা আমাদের জন্য। আসিফ নজরুল: অধ্যাপক, আইন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।-সূত্র: প্রথম আলো

News Page Below Ad